অত্যুজ্জ্বল স্মৃতি রোমন্থন

 অত্যুজ্জ্বল স্মৃতি রোমন্থন লেখাটিতে পাবনা জিলা স্কুলের ২০১৪ থেকে ২০২২ এর গৌরবময় স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। যাবতীয় ভুল ত্রুটি ক্ষমার জন্য অনুরোধ করছি।

পাবনা জেলা স্কুল, পাবনা জিলা স্কুল, Pabna Zilla School, Pabna, Bangladesh, School, PZS, PZSP, ব্যতিক্রম"22, ব্যতিক্রম 22, ব্যতিক্রম"২২, ব্যতিক্রম ২২

Memories এমন একটা জিনিষ যা আমাদের সবার মধ্যেই আছে। পাবনা জেলা স্কুলে ৮ বছর থেকে আর কিছু না নিতে পারলেও memory বা স্মৃতি যে নিয়ে যেতে সবাই পারবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ করাটাই বোকামি। মেমোরি নিয়ে American Philosopher John Dewey (1859-1952) এর একটা উক্তি আছে : Time and memory are true artists; they remould reality nearer to the heart’s desire. ড. সিয়াস এই বিষয়ে বলেন: এমন কিছু মুহূর্ত আছে যার মূল্য তুমি তা স্মৃতি না হওয়া পর্যন্ত বুঝতে পারবে না।

এ বাক্যগুলো সর্বাংশে সত্য, ঠিক যেমনটি সত্য আমাদের ক্ষেত্রে। আজ আমরা যা সম্পর্কে লিখছি, তাকে কোনো কোনো গল্প বা কাহিনী বলা ঠিক হবে কি না জানা নাই কিন্তু তাকে বোধ হয় উপন্যাস বলা ভুল হবে না। একটি সুন্দর সমাপ্ত উপন্যাস, আমাদের মনে যার স্থায়ীত্বকাল হবে দীর্ঘ, যার প্রভাব হতে যাচ্ছে সুদূরপ্রসারী।

শুরুর সময়টা ছিল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৩। ছোট ছোট একদল ছেলে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ সেই বিজ্ঞানভবন আর প্রশাসনিক ভবনের বারান্দা। সঙ্গে অভিভাবকগণও রয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই, ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। কেউ গান গাইছে না, কেউ নাচছে না কিন্তু তারপরেও সবার মনে বিরাজ করছে এক অদৃশ্য আনন্দ। বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল সেটা। আর আনন্দ থাকবে না-ই বা কেনো, ছেলেগুলো তো এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে এ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে ওই সময় প্রায় ২০০০ জনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। তাই হয়তো অন্যদের তুলনায় এদের আনন্দ অনেক বেশি ছিল। তবে বিদায় মহুর্তে যে সেই সবাই আছে তা কিন্তু না, অনেকে দূরে বদলি হয়ে চলে গেছে, আবার অনেকে এখানে এসেছে বদলি হয়ে। যে যেখান থেকেই আসুক না কেনো তারা এই পাবনা জেলা স্কুলের ছাত্র। এ সেই বিদ্যালয় যেখানে পড়েছেন ডা. ফজলে রাব্বি, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, স্যার ফজলে হাসান আবেদ সহ আরো অনেকে। কাজেই এ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে সবাই ছিল প্রচন্ড আনন্দিত। অভিভাবকগণও ছিলেন বেশ খুশি, সে খুশি ছিল স্বপ্ন ও প্রত্যাশা মিশ্রিত।

পাবনা জেলা স্কুল, পাবনা জিলা স্কুল, Pabna Zilla School, Pabna, Bangladesh, School, PZS, PZSP, ব্যতিক্রম"22, ব্যতিক্রম 22, ব্যতিক্রম"২২, ব্যতিক্রম ২২

বড় খেলার মাঠে ক্লান্তিহীন দৌড়, পানির বোতল দিয়ে ফুটবল খেলা, ছোটাছুটি আর দুষ্টুমি ছিল আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার-স্যপার।

টিফিন বিষয়টা ছিল অন্যরকম। টিফিনে কী দেওয়া হবে তা নিয়ে কৌতূহল থাকতো সবসময়ই। বাইরের খাবার তো আছেই। টিফিনের সামান্য সময় কত কাজ যে শেষ করার তাড়া থাকতো আমাদের! পানি ভরতে গিয়ে দেরি হলে আবার স্যারের বকুনি খেয়ে ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার চিত্রটাও ছিল দারুন। প্রাত্যহিক সমাবেশে তাজা বাতাসে গলা ছেড়ে গাওয়া হতো জাতীয় সঙ্গীত। ওই সময় আমাদের শপথ বাক্য পাঠ করানো হতো। আমরা শপথ নিতাম, অন্যায় এবং দুর্নীতি করবো না এবং অন্যায় এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবো না। আমরা কামনা করি, সেই শপথের মর্যাদা আমরা যেন রাখতে পারি। সমাবেশ শেষে সারিবদ্ধভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করানো হতো। সে সময় অবশ্য ধাক্কাধাক্কিও হতো।

এ বিদ্যালয়ের টয়লেট এক রহস্যময় বস্তু এবং পরীক্ষার সময় তা আরো বেশী রহস্যময় হয়ে উঠতো। বিশেষ করে বড় ভাইয়াদের "শলাকা" ধরানোর বিষয়টা এটাকে খাপছাড়া করে তুলতো। তার সাথে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নানা রকমের আঁকিবুকি সেখানে স্থান পেত।

পাবনা জেলা স্কুল, পাবনা জিলা স্কুল, Pabna Zilla School, Pabna, Bangladesh, School, PZS, PZSP, ব্যতিক্রম"22, ব্যতিক্রম 22, ব্যতিক্রম"২২, ব্যতিক্রম ২২

আমাদের দিবা শাখায় গ্রীষ্মকালে কড়া রোদের তীক্ষ্ণতায় যেন সবার জীবনিশক্তি বৃদ্ধি পেত। স্কুলে বৃষ্টি উপভোগ করার সৌভাগ্যও আমাদের হয়েছে কয়েকবার। শীতকালে নেভি ব্লু সোয়েটারে প্রভাতি ও দিবা শাখার ছাত্রদের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়তো। স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানগুলো সাধারণত আয়োজিত হতো বসন্তের রাঙানো রঙে। সেখানে নানা রকমের আয়োজন আমাদের অনেক আকর্ষণ করতো। বিশেষ করে ভলান্টিয়ার ভাইয়ারা আর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা বার্ষিক ভোজনের দিনে খাবারের ডিস নিয়ে দৌড়াতেন, যেটা অনুষ্ঠানকে একটা মাত্রা এনে দিত।

আমাদের একেকজন শিক্ষক ছিলেন একেকজন কিংবদন্তী, বিচিত্র জীবনদর্শনের এক অপূর্ব সমাহার। কারো ক্লাসের সামনে নীল ডাউনরত ছাত্রদের সারি, কারো ক্লাসে গানের আওয়াজ, কারো ক্লাসে আবার পিনপতন নিরবতা। কেউ গণিত পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করলে পাসের হার কমে যেতো, কেউবা পরীক্ষার হলে গার্ডে পড়লে “হালাল পরীক্ষা” হতো ও কাউকে বা “বস” বলে সম্বোধন করাই ছাত্রদের প্রিয় ছিল। কেও বা সিগারেট সেবন বা কুকাজ করা শিক্ষার্থীর পিছনে লেগে থাকতো। মূলত তাঁদের এই বিচিত্র জীবনদর্শন ও আর্দশই আমাদের গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাঁদের প্রতি অগণিত শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি, কারণ তারাই আমাদের জীবনের ৮ টি বছর জুড়ে আছেন।

তবে জেলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা এক বিস্ময়। তারা শুরুতে শয়তান উপাধি পেলেও পড়ে তারা ভদ্র হয়ে যায়, আর শুরুতে ভদ্র খ্যাত শিক্ষার্থীরা অনেক সময়ই তথাকথিত শয়তানদের মতো হয়ে যায়। বিদ্যালয়ে থাকাকালীন কিছু ভাইয়াদের "স্কুল পালানো" কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিদ্যালয়ের ফটকের অবস্থা তার সাথে মানানসই হয়ে যাওয়া আমাদের স্মৃতিতে সারাজীবন থাকবে। এই স্কুলের একতা সারা পাবনায় মধ্যে সবচাইতে মজবুত। কমিউনিটি হিসেবে এটা অনেক মজবুত। জেলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা কখনো আমাদের ৭০০ টাকার পণ্য ৪৫০ টাকায় ছেড়ে দিয়েছেন আবার কোনো কোনো ডাক্তার তাদের ভিসিট ই নেয় নি। এই স্কুলের শিক্ষকেরা অনেক আন্তরিক। এরকম আন্তরিক শিক্ষক সারা পাবনায় দ্বিতীয়টি দেখার ভাগ্য হয় নি। তবে ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট আয়নাল হক স্যারের মৃত্যু এবং ২০২০-২১ সালে হাসুরুল হক স্যারের ব্রেইন টিউমার এবং ক্যান্সার ধরা পড়া আমাদের অনেক ব্যথিত করেছে।

জেলা স্কুলে আটটি বছর কত সহজে কেটে গেলো; কত হারানো, কত অর্জন, কত সুখস্মৃতি! এ এক মিশ্র অনুভূতি। পাবনা জেলা স্কুল, তুমি ভালো থেকো ও নবাগতদের ভালো রেখো। কখনো আর হয়তো খাকি প্যান্ট ও সাদা শার্টে ফিরবো না। কিন্তু তোমার নিশান হৃদয়ে নিয়ে পৃথিবী ঘুরবো।

আমরা সামান্য একজন মাত্র; শেষ করার সময় অবশ্যই বলতে হয় - ভাষার দূর্বলতা, শব্দভাণ্ডারের দীনতা ও যাবতীয় ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

Written by:

আহসান হারিস আহমেদ (শান্ত),

মো: রাকিবুল হাসান রাতুল

৩০ এপ্রিল, ২০২২

Post a Comment

0 Comments